চন্দন যাত্রা


অক্ষয় তৃতীয়া মাহাত্ম্য:

বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিকেই অক্ষয় তৃতীয়া বলা হয় । হিন্দু শাস্ত্রানুসারে অক্ষয় তৃতীয়া অনন্য তাৎপর্যময় এবং পরম মাহাত্ম্যপূর্ণ তিথি। অক্ষয় শব্দের অর্থ হলো যার ক্ষয় নেই ; তাই এই মহাপবিত্র তিথিতে কোন শুভকার্য সম্পাদন করলে তা অনন্তকাল অক্ষয় হয়ে থাকে।বিষ্ণুপুরাণে বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া বা অক্ষয় তৃতীয়াকে 'যুগাদ্যা' নামে অভিহিত করা হয়েছে। যুগাদ্যা হল যুগের প্রথম দিন। অক্ষয় তৃতীয়া হল সত্য যুগের যুগাদ্যা। অর্থাৎ সত্যযুগের প্রথম দিন। যুগাদ্যা তিথি এবং এর মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে শ্রীসনৎকুমার বলেন: বৈশাখমাসস্য চ যা তৃতীয়া নবম্যসৌ কার্তিকশুক্লপক্ষে। নভস্য মাসস্য চ কৃষ্ণপক্ষে ত্রয়োদশী পঞ্চদশী চ মাঘে৷৷ এতা যুগাদ্যাঃ কথিতাঃ পুরাণে- ষ্বনন্তপুণ্যাস্তিথয়শ্চতস্রঃ। উপপ্লবে চন্দ্রমসো রবেশ্চ ত্রিষ্বষ্টকাস্বপ্যয়নদ্বয়ে চ৷৷ পানীয়মপ্যত্র তিলৈর্বিমিশ্রং দদ্যাৎ পিতৃভ্যঃ প্রযতো মনুষ্যঃ। শ্ৰাদ্ধং কৃতং তেন সমাসহস্ৰং রহস্যমেতৎ পিতরো বদন্তি৷৷ (বিষ্ণুপুরাণ: ৩.১৪.১২-১৪) "বৈশাখমাসের শুক্লা তৃতীয়া, কার্তিকের শুক্লা নবমী, ভাদ্রপদের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী এবং মাঘ মাসের অমাবস্যা— এ চার তিথিকে পুরাণে ‘যুগাদ্যা’ নামে অভিহিত করা হয়। এই চারতিথি অনন্ত পুণ্যদায়িনী। চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের সময়, তিন অষ্টকাতে অথবা উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের আরম্ভে যে ব্যক্তি একাগ্র চিত্তে পিতৃ-পুরুষকে তিলসহ শুধুমাত্র জলও দান করেন, তাঁর একসহস্র বর্ষের শ্রাদ্ধকর্মের ফল লাভ হয়। সকলের অবিদিত এই পরম রহস্যময় দিবসসমূহের মাহাত্ম্যকথা স্বয়ং পিতৃগণই বলেন।" মহাপুরাণগুলোর মধ্যে অন্যতম 'মৎস্য পুরাণ'। মৎস্য পুরাণে অক্ষয় তৃতীয়ার ব্রতফল সম্পর্কে বলা হয়েছে, বৈশাখ মাসের শুক্লা-তৃতীয়া তিথিতে দান-হোম-জপ যাহা কিছু করা যায়, সে সকলেই অক্ষয় হইয়া যায়।অক্ষয় তৃতীয়ায় যারা উপবাস করে, তাঁরা অক্ষয় ফল লাভ করে।তবে কৃত্তিকানক্ষত্র যুক্ত তৃতীয়া অধিক মাহাত্ম্যপূর্ণ এবংঅভীষ্ট ফলদায়ক।

।।ঈশ্বর উবাচ।। অথান্যামপি বক্ষ্যামি তৃতীয়াং সর্বকামদাম্। যস্যাংদত্তং হুতং জপ্তং সর্বং ভবিত চাক্ষয়ম্।। বৈশাখশুক্লপক্ষে তু তৃতীয়া যৈরুপোষিতা। অক্ষয়ফলমাপ্নোতি সর্বস্য সুকৃতস্য চ।। সা তথা কৃত্তিকোপেতা বিশেষনে সুপূজিতা। তত্র দত্তং হুতং জপ্তং সর্বক্ষয়মুচ্যতে।। অক্ষতৈস্তু নরাঃ স্নাত্বা বির্ষ্ণোর্দত্ত্বা তথাক্ষতান্। বিপ্রেষু দত্ত্বা তানেব তথা শক্তূন্ সুসংস্কৃতান্। যথান্নভুষ্মহাভাগঃ পলমক্ষয়মপ্নুতে।। একামপ্যুক্তবৎ কৃত্বা তৃতীয়াং বিধিবন্নরঃ। এতাসামপি সর্বাসাং তৃতীয়ানাং ফলং ভবেৎ।। তৃতীয়ায়াং সমভ্যর্চ্য সোপবাসো জনার্দনম্। রাজসূয়ফলং প্রাপ্য গতিমগ্রাঞ্চ বিন্দতি।। (মৎস্যপুরাণ: ৬৫.১-৭)

"ঈশ্বর বললেন, অনন্তর অপর এক সর্বকামদায়িনী তৃতীয়া তিথির বিষয় বলছি। এ তিথিতে দান, হোম, জপ যা কিছু করা যায়, সে সকলই অক্ষয় হয়ে যায়। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষীয় তৃতীয়া তিথিতে যে সকল ব্যক্তি উপবাস করে, তারা নিখিল সুকৃতি সঞ্চয়ের অক্ষয় ফল লাভ করে। এ তৃতীয়া তিথি কৃত্তিকানক্ষত্রে অন্বিতা হলে সবিশেষ প্রশস্ত হয় । তাতে দান, হোম বা জপ যে কিছু করা যায়, তা সকলই অক্ষয় ফলজনক বলে শাস্ত্রে কীৰ্ত্তিত। এ তিথিতে ব্রতকারিণী রমণীর সন্ততি ও সুকৃতি অক্ষয় হয়ে থাকে। নরগণ অক্ষত দ্বারা স্নান করে বিষ্ণুকে অক্ষত ও বিপ্রবর্গকে সুসংস্কৃত ছাতু প্রদান করে স্বয়ং যথানির্দিষ্ট অন্ন ভোজন করলে মহাসৌভাগ্যশালী হয়ে অক্ষয় ফল প্রাপ্ত হয়। নর বিধিপূর্ব্বক উল্লিখিতরূপে এক- বার মাত্র অক্ষয়তৃতীয়াব্রত করলেও সমস্ত অক্ষয়তৃতীয়াব্রতের ফল লাভ করে। এ তৃতীয়ার উপবাস করে জনার্দনকে অর্চনা করলে মনুষ্য রাজসূয় যজ্ঞের ফল লাভ করে দেহান্তে উত্তম গতি পাপ্ত হয়।" অক্ষয় তৃতীয়া সম্পর্কে শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক স্মার্তচূড়ামণি শ্রীরঘুনন্দন ভট্টাচার্য প্রণীত "তিথিতত্ত্বম্" গ্রন্থে যা বলা আছে তাই সংক্ষেপে সংস্কৃত শ্লোক থেকে বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তুলে ধরছি। স্মৃতিতে বলা আছে - বৈশাখ মাসের শুক্লতৃতীয়া যদি কৃত্তিকা বা রোহিণীনক্ষত্র যুক্ত হয়, তবে তাকে অক্ষয় তৃতীয়া বলে। এ দিনে দান সহ যে যে পবিত্র কর্ম করা হয় তার সকল ফলই অক্ষয় হয়।ভবিষ্যোত্তর পুরাণে বলা আছে - বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের যে তৃতীয়া তিথি, তা জগতে অক্ষয় নামে প্রসিদ্ধ, তাই দেবগণেরও প্রিয় এ তিথি। যে মনুষ্য এ দিনে জল ও অন্ন-সম্মিলিত কুম্ভ দান করে সে জ্যোতির্ময় সূর্যলোক প্রাপ্ত হয়।ব্রহ্মপুরাণে বলা আছে - বৈশাখমাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়াতে যে ব্যক্তি চন্দনচর্চিত ভগবান শ্রীহরি বিগ্রহ দর্শন করে, সে ভগবানের পরমধামে গমন করে।আরও বলা আছে - শ্রীভগবান বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়াতে সত্যযুগের অবতারণা করেন এবং খাদ্যশস্য হিসেবে যবের উৎপত্তি করেন। তাই এ দিনে যব দ্বারা ভগবানের পূজা করবে এবং ব্রাহ্মণ সহ সকলকে যব দান করবে এবং ভোজন করাবে। এদিনে পতিতপাবনী গঙ্গাও পৃথিবীতে অবতরণ করে। তাই এ দিনে মহাদেব, গঙ্গা,কৈলাস ও হিমালয় পর্বতাদির পূজা করবে এবং সাথে সাথে সগরকুলের ধুরন্ধর ভগীরথ রাজারও পূজা করবে। এ দিনে স্নান,দান, তপ,শ্রাদ্ধ এবং হোম ইত্যাদি যে যে মঙ্গলময় অনুষ্ঠান করবে, তা সকলই অক্ষয় ফল দান করবে।অক্ষয় তৃতীয়াতে ভগবানের বিগ্রহাদির শরীরে শোভন ও সুগন্ধ লেপনদ্রব্য চন্দন প্রভৃতি লিপ্ত করা হয়। স্কন্ধপুরাণের বিষ্ণুখণ্ডে বৈশাখমাস মাহাত্ম্য নামক অংশের বিভিন্ন স্থানেই শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথির মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। শ্রুতদেব উবাচ। অথাতঃ সম্প্ৰবক্ষ্যামি মাহাত্ম্যং পাপনাশনম্ । অক্ষয্যায়াতৃতীয়ায়াঃ সিতে পক্ষে চ মাধবে ॥ যে কুর্বন্তি চ তস্যাং বৈ প্রাতঃ স্নান: ভগোদয়ে। তে সর্বে পাপনির্মুক্তা যান্তি বিষ্ণোঃ পরং পদম্ ॥ দেবান্ পিতৃন্মুনীন্ যস্ত কুর্য্যাদুদ্দিস্য তৰ্পণম্। তেনাধীতঞ্চ তেনেষ্টং তেন শ্রাদ্ধশতং কৃতম্ ॥ মধুসূদনমভার্চ্চ্য কথাং শৃণ্বন্তি যে নরাঃ। অক্ষয্যায়াং তৃতীয়ায়ান্তে নরা মুক্তি ভাগিনঃ ॥ যে দানং তত্র কুর্বন্তি মধুদ্বিট্‌ প্রীতয়ে শুভম্। তদক্ষয্যং ফলত্যের মধুশাসনশাসনাৎ ॥ দেবর্ষিপিতৃদৈবত্যা তিথিরেষা মহাশুভা। ত্রয়াণাং তৃপ্তিদাত্রী চ কৃতে ধর্মে সনাতনে ॥ (স্কন্দ পুরাণ: বিষ্ণুখণ্ড, বৈশাখমাস মাহাত্ম্য, ২৩.১-৬)

"শ্ৰুতদেব বললেন,— অনন্তর বৈশাখমাসের শুক্লপক্ষীয় অক্ষয়তৃতীয়ার পাপনাশন মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি। যারা অক্ষয় তৃতীয়ার সূৰ্য্যোদয়ে প্রাতঃস্নান করে, তারা পাপ মুক্ত হয়ে বিষ্ণুর পরমপদ প্রাপ্ত হয়। যে মানব এই পুণ্যতিথিতে দেব, পিতৃ ও মুনিগণের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে, তার সমস্ত অধ্যয়ন, সমস্ত যজ্ঞ ও শত শ্রাদ্ধ করার পুণ্য লাভ হয়। যে সকল লোক অক্ষয় তৃতীয়ায় মধুসূদনের পূজা করে এবং তাঁর পুণ্যকথা শ্রবণ করে, সেই পুণ্যবান ব্যক্তিরা মুক্তি লাভ করে । যে নর এই তিথিতে ভগবানের প্রীতির জন্য মনোজ্ঞ দান করে, মধুশাসনের শাসনে তার সেই দান অক্ষয়ফল দান করে। শুভদায়িনী এ পুণ্যতিথিতে দেবতা, ঋষি, এবং পিতৃগণকে উদ্দেশ্য করে ধৰ্মকৰ্ম করলে সেই সকল কর্মই অক্ষয় হয়। অক্ষয় তৃতীয়া দেব, ঋষি ও পিতৃগণ এই ত্রিলোকেরই তৃপ্তিদান করে থাকে।" রঘুনন্দনের বলা ছাড়াও আরো অসংখ্য মাহাত্ম্যপূর্ণ এবং তাৎপর্যময় ঘটনার তিথি পবিত্র এ অক্ষয় তৃতীয়া। ভগবান শ্রীপরশুরাম অবতাররূপে আসেন এ দিনেই। শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়নবেদব্যাস এ দিনেই মহাভারতের রচনা শুরু করেন।দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী ধুমাবতীর আবির্ভাব এ দিনেই। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় চারধামের অন্যতম কেদার বদরীনাথের মন্দির ছয়মাস বন্ধ থেকে এ দিনেই তার দ্বার খুলে দেয়া হয়। দ্বার খুললেই অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ দৈব অক্ষয়দীপের দর্শন হয় সকলের।কুবেরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান মহাদেব তাঁকে অতুল ঐশ্বর্য প্রদান করেন এদিনেই। কুবেরের লক্ষ্মী এবং অতুল ঐশ্বর্য লাভ হয়েছিলো বলে এদিনে তাই বৈভব-লক্ষ্মীর পূজা করা হয়।পুরীধামে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উপলক্ষে রথ নির্মাণ এ দিন থেকেই শুরু হয়ে জগন্নাথদেবের ২১ দিনব্যাপী চন্দনযাত্রা উৎসবের সূচনা ঘটে।সকল দেবস্থানে বিশেষ করে বৈষ্ণবদেবস্থানে এ দিন থেকেই মহাধুমধামে চন্দনযাত্রা উদযাপিত হয়। বঙ্গের সাধকপুরুষ রামচন্দ্রদেবের এ দিনে তিরোধান দিবস। তাই এ দিনে সারাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ নোয়াখালীর চৌমুহনীতে স্থিত তাঁর সমাধিবেদিতে জল দান করেন। বৃহদ্ধর্মপুরাণে বলা হয়েছে ভগবান শিবের পরমপ্রিয় শ্রীফল বা বেলগাছের জন্ম হয়েছে , বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে। দেব্যুবাচ । বৈশাখে শুক্লপক্ষ্যস্য তৃতীয়ায়াং সখিদ্বয়। জাতো বৈ শ্রীফলতরুর্মাহাত্ম্যং তস্য কথ্যতে।। জাতে তু শ্রীফলতরৌ দেবাঃ সৰ্ব্বে সবাসবাঃ। ব্রহ্মা নারায়ণশ্চাপি দেবপত্ন্যুঃ সমাগতাঃ।। দদৃশুঃ স্নিগ্ধবিটপং ত্রিপত্রৈঃ সুদলৈৰ্ষতম্। দীপ্যমানং তেজসৈব শিবরূপং শিবপ্রদম্।। প্রণেমুঃ সিষিচুস্তত্র বাসং চক্রঃ সুখান্বিতাঃ। তত্র ক্ষণায় ভগবানুবাচ বিষ্ণুরব্যয়ঃ।। (বৃহদ্ধর্মপুরাণ: পূর্বখণ্ড, ১১.১-৪) 'দেবী বললেন, হে সখীগণ! শ্রীফলবৃক্ষ বা বেলগাছ বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে উৎপন্ন হয়। এক্ষণে আমি সে বৃক্ষের মাহাত্ম্য বলছি। শ্রীফলবৃক্ষ উৎপন্ন হলে ভগবান্ ব্রহ্মা নারায়ণ ও ইন্দ্রাদি দেবগণ এবং সমুদয় দেবপত্নীগণ তথায় আগমন করে কোন ত্রিপত্রযুক্ত, নিজতেজে দেদীপ্যমান শিবরূপী ঐ বৃক্ষকে সন্দর্শন করে প্রণিপাত ও জলসেচন-পুরঃসর পরমসুখে তথায় অবস্থান করতে লাগলেন ৷" তাই এদিনে আমরা যদি ভালো কাজ করি, তবে আমাদের অক্ষয় পূণ্য লাভ হবে পক্ষান্তরে তামসিক খারাপ কাজের ফল হবে অক্ষয় পাপের যমযন্ত্রণা । তাই এদিন খুব সাবধানে প্রতিটি কাজ করা উচিত। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এ দিন ভুলেও যেন কোনো পাপকাজ আমাদের দ্বারা না হয়ে যায়। ভুলেও যেন মন্দ-কটু কথা না বেরোয় আমাদের মুখ থেকে। তাই এদিন যথাসম্ভব সাত্ত্বিকভাব থাকা প্রয়োজন। আর এদিন পূজা,জপ,ধ্যান,দান,অপরের মনে আনন্দ দেয়ার মত কাজ করা উচিত। দিনটি ভালোভাবে কাটানোর অর্থ সাধনজগতের পথে অনেকটা এগিয়ে ঈশ্বরের নৈকট্যলাভ।


অক্ষয় তৃতীয়ার তাৎপর্য:

১. এই শুভদিনে বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার (শ্রীমদ্ভাগবত অনুযায়ী ভগবানের ষোড়শ অবতার) পরশুরাম আবির্ভূত হয়েছিলেন।
২. মহর্ষি বেদব্যাস ও গণেশ এই দিনে মহাভারত রচনা আরম্ভ করেছিলেন।
৩. এই দিনে রাজা ভগীরথ গঙ্গা দেবীকে মর্ত্যে নিয়ে এসেছিলেন।
৪. এইদিনে সত্যযুগ শেষ হয়ে ত্রেতাযুগের সূচনা ঘটে। ঋষিগণ, ভক্তগণ এই দিনটির স্মরণে যজ্ঞের আয়োজন করেন এবং যজ্ঞের প্রধান উপকরণ হিসেবে বার্লি রাখা হয়।
৫. এই দিনই ভক্তরাজ সুদামা শ্রীকৃষ্ণের সাথে দ্বারকায় গিয়ে দেখা করেন এবং তাঁর থেকে সামান্য চালভাজা নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সকল দুঃখ মোচন করেন।
৬. এদিন থেকেই পুরীধামে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উপলক্ষ্যে রথ নির্মাণকাজ শুরু হয়।
৭. এদিন দেবী অন্নপূর্ণার আবির্ভাব ঘটে।
৮. এদিনই দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে যান এবং শরণাগতের পরিত্রাতা হিসেবে সখী কৃষ্ণাকে রক্ষা করেন শ্রীকৃষ্ণ।
৯. এদিন কুবেরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে অতুল ঐশ্বর্য প্রদান করেন।
১০. কেদার বদরী গঙ্গোত্রী যমুনত্রীর যে মন্দির ছয়মাস বন্ধ থাকে এই দিনেই তার দ্বার উদ্ঘাটন করা হয়। দ্বার খুললেই দেখা যায় সেই অক্ষয়দ্বীপ যা ছয়মাস আগে জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল।


চন্দন যাত্রা:

চন্দন যাত্রা চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে শুরু হয়ে ২১ দিন পর্যন্ত চলে। ভগবান শ্রীজগন্নাথদেব এই দিনে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে চন্দনযাত্রা মহোৎসবটি পালন করার জন্য সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। ভগবানের অঙ্গলেপন এক ধরণের ভক্তিমূলক কর্ম এবং চন্দন হল সর্বশ্রেষ্ঠ প্রলেপন। যেহেতু ভারতে বৈশাখ মাস অত্যন্ত উষ্ণ থাকে, তাই চন্দনের শীতল গুণ ভগবানের আনন্দ প্রদান করে। জগন্নাথের দুই চক্ষু ব্যতীত সর্বাঙ্গে চন্দন লেপন করা হয়ে থাকে। এবং উৎসব-মূর্তি বা বিগ্রহগণকে নিয়ে শোভাযাত্রা করা হয় এবং মন্দির পুষ্করিণীতে নৌকাবিহার করা হয়ে থাকে। অক্ষয় তৃতীয়াতে বিশ্বের ইসকন মন্দিরসহ বৃন্দাবনের সমস্ত বড় গোস্বামী মন্দিরের বিগ্রহ চন্দনে লেপন করা হয়ে থাকে। মহাভারতে উল্লেখিত, পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসের সময় বিরাট রাজার প্রাসাদে ছদ্মবেশে থাকতেন। ভীম কর্তৃক কিচক নিধনের পর বিরাট রাজা অনুধাবণ করতে পেরেছিলেন যে, তাঁর প্রাসাদে পাণ্ডবরা থাকছেন। বিরাট রাজা তাঁদের প্রতি অনেক গর্ববোধ করলেন এবং মিত্রতার সম্পর্ক স্থাপন করলেন। যুধিষ্ঠির তখন তপ্ত গ্রীষ্মে শ্রীকৃষ্ণের পরিতৃপ্তির জন্য নৌকাভ্রমণের আয়োজন করতে বিরাট রাজাকে উপদেশ করলেন। গ্রীষ্মের তাপে ভগবানের প্রীতিবিধানার্থে, ভগবানের শরীর সুবাসিত করার লক্ষ্যে বিরাট রাজা সুগন্ধি জলে চন্দন বাটা মিশিয়ে সবকিছুর আয়োজন করলেন। বিরাট রাজার ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে ভগবান তাঁর অগ্রজ ভ্রাতা বলরামকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। কৃষ্ণ, বলরাম এবং পঞ্চপাণ্ডব স্নানযাত্রা এবং বিহার উৎসব উপভোগ করলেন এবং বিরাট রাজা তাঁর ভক্তিমূলক বাসনা পরিপূর্ণ করলেন। পরে এ ঘটনাটির স্মরণে ভগবান পঞ্চপাণ্ডবদের নিয়ে নরেন্দ্র সরোবরে চন্দন যাত্রার আয়োজন করেন। মাধবেন্দ্রপুরী, যিনি ছিলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একজন মহান ভক্ত, তিনি যখন বৃন্দাবনে ছিলেন, একদিন স্বপ্নে গোপালকে জঙ্গলে দেখতে পেলেন, গোপাল তাঁকে বলছেন, “মাধব, আমি জঙ্গলে মাটির নিচে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আছি। দয়া করে আমার স্থানটি খুঁড়ে আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপন কর।” তখন মাধবেন্দ্রপুরী গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় ঐ স্থানটি খুঁড়ে গোপালের বিগ্রহ দেখতে পেলেন এবং তা গোবর্ধন পর্বতের চূড়ায় স্থাপন করলেন। একদিন গোপাল মাধবকে বলছেন, “আমি অনেকদিন ধরে মাটির নিচে ছিলাম, তাই আমার শরীর জ্বালাপোড়া করছে। তুমি কি জগন্নাথপুরী থেকে কিছু চন্দনকাঠ এনে আমার শরীরে লেপন করে দেবে?” মাধবেন্দ্রপুরী তখন বৃদ্ধ ছিলেন, কিন্তু তিনি গোপালের আদেশ অমান্য করতে পারেননি। তিনি জগন্নাথপুরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি যখন রেমুণায় পৌঁছলেন, যেখানে উড়িষ্যা ও বাংলার সীমান্তে গোপীনাথের মন্দির রয়েছে, তিনি সেখানে সারারাত ছিলেন এবং দেখলেন, পূজারী ১২টি পাত্রে গোপীনাথকে ক্ষীর অর্পণ করেছিলেন। তখন মাধবেন্দ্রপুরী ভাবলেন, “আমি যদি এক কণা ক্ষীরের স্বাদ নিতে পারতাম, তাহলে আমিও বৃন্দাবনে আমার গোপালের জন্য তৈরি করতে পারতাম। ইতোমধ্যেই, তাঁর চেতনা তাঁকে ধিক্কার দিল, ওঃ আমি কত বোকা! ভগবান ভোগ গ্রহণের পূর্বেই আমি তা খাওয়ার চিন্তা করছি।” ভুল বুঝতে পেরে তিনি শীঘ্রই মন্দির ত্যাগ করে বাইরে একটি গাছের নিচে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করে রজনী অতিবাহিত করতে লাগলেন। অধিক রাতে, গোপীনাথ বিগ্রহ পূজারীর সম্মুখে স্বপ্নে আবির্ভূত হলেন এবং বলতে লাগলেন, “আমি আমার আঁচলের নিচে এক পাত্র ক্ষীর লুকিয়ে রেখেছি। তুমি সেটি নিয়ে মন্দিরের বাইরে বৃক্ষতলে অবস্থানরত মাধবেন্দ্রপুরীকে দাও।” পূজারী যথারীতি তা করল এবং সবকিছু মাধবেন্দ্রপুরীকে খুলে বলল। এরপর, গোপীনাথ তাঁর ভক্তের প্রতি এহেন কাজ করেছিলেন বিধায় ক্ষীরচোরা গোপীনাথ রূপে খ্যাত হলেন। পরদিন সকালে, মাধবেন্দ্রপুরী চন্দন কাঠ আনার উদ্দেশ্যে জগন্নাথপুরীর উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা শুরু করলেন। তিনি পুরী পৌঁছানোর পূর্বেই গোপীনাথের ক্ষীরচুরির সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। জগন্নাথপুরীতে, তিনি পূজারীর নিকট গোপালের অভিলাষ বিস্তারিতভাবে বললেন। পূজারী তাঁকে পুরীর রাজার নিকটে নিয়ে গেলেন। তাঁর কথা শুনে রাজা তাঁকে এক মণ (প্রায় ৩৭ কেজি) বিশেষ চন্দন দিলেন, এবং দুইজন নিরাপত্তাকর্মীকে বললেন মাধবের যেন কোনোরূপ সমস্যায় পড়তে না হয়। ফেরার পথে, যখন তিনি গোপীনাথ মন্দিরের নিকটে পৌঁছলেন, তখন গোপাল স্বপ্নাদেশে তাঁকে বললেন, “মাধব, তুমি গোপীনাথের শরীরেই চন্দন লেপন কর, এবং আমিও তা গ্রহণ করব, যেহেতু গোপীনাথ আর আমি একই।” মাধবেন্দ্রপুরী তখন সকল গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে গোপীনাথের শরীরে চন্দন লেপন করলেন। এরপর থেকে ঐ ঘটনা স্মরণে চন্দন যাত্রা মহোৎসব পালন করা হয়ে থাকে।